অনলাইনে নতুন ভোটার আইডি কার্ড করার নিয়ম ২০২৬, ঘরে বসেই আবেদনের সহজ উপায়
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (EC) দেশের নাগরিকদের জন্য নতুন ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card) তৈরির প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং সহজ করেছে। এখন আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয় না, ইন্টারনেট সংযোগ থাকা যেকোনো স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে ঘরে বসেই নতুন ভোটারের অনলাইন ফরম পূরণ করা সম্ভব। ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করতে পারবেন।
অনলাইনে প্রাথমিক আবেদন ফরম (ফরম-২) পূরণের পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নিকটস্থ উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে গিয়ে ১০ আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ এবং ছবি প্রদান করলেই সম্পন্ন হয় বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যে মোবাইলে এসএমএস আসার পর অনলাইন থেকেই অফিশিয়াল ডিজিটাল এনআইডি কপি ডাউনলোড করা যায়। নিচে ২০২৬ সালের হালনাগাদ নিয়ম অনুযায়ী নতুন ভোটার আইডি কার্ড করার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, অনলাইন আবেদন পদ্ধতি ও কার্ড সংগ্রহের পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
নিয়মিত সরকারি চাকরি, নোটিশ ও নাগরিক সেবা সংক্রান্ত সকল আপডেট পেতে যুক্ত থাকুন আমাদের সাথে
একনজরে নতুন ভোটার আইডি কার্ড নিবন্ধন ২০২৬
| বিবরণ | তথ্য ও সেবা বিবরণী |
|---|---|
| সেবার নাম | নতুন ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) আবেদন |
| প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ | জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (NIDW) |
| অফিসিয়াল ওয়েবসাইট | services.nidw.gov.bd |
| ন্যূনতম বয়সসীমা | ১৮ বছর বা তার বেশি (নাগরিকত্ব প্রমাণ সাপেক্ষে) |
| আবেদন ফি | সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (সরকারি কোনো ফি প্রদান করতে হয় না) |
| প্রয়োজনীয় প্রধান ডকুমেন্ট | ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ, শিক্ষাগত সনদ ও নাগরিকত্ব সনদ |
| বায়োমেট্রিক প্রদান কেন্দ্র | সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিস |
| আইডি কার্ড প্রাপ্তির মাধ্যম | অনলাইন থেকে ডিজিটাল পিডিএফ ডাউনলোড এবং পরবর্তীতে প্লাস্টিক/স্মার্ট কার্ড বিতরণ |
নতুন ভোটার হওয়ার যোগ্যতা ও শর্তাবলী
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা আইন অনুযায়ী ভোটার হওয়ার জন্য একজন নাগরিকের নিম্নলিখিত যোগ্যতাগুলো থাকা বাধ্যতামূলক:
- নাগরিকত্ব: আবেদনকারীকে অবশ্যই জন্মসূত্রে বা আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে।
- বয়সসীমা: সংশ্লিষ্ট বছরের ১ জানুয়ারি তারিখে প্রার্থীর বয়স ন্যূনতম ১৮ বছর পূর্ণ হতে হবে। তবে ১৬ বা ১৭ বছর বয়সীরাও অগ্রিম তথ্য দিয়ে রাখতে পারেন, যা ১৮ বছর পূর্ণ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়।
- মানসিক সুস্থতা: উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ বা মানসিক ভারসাম্যহীন ঘোষিত না হওয়া।
- একক নিবন্ধন: পূর্বে বাংলাদেশের কোথাও ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হননি। দ্বৈত ভোটার হওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
নতুন ভোটার হতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা
অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণের সময় এবং পরবর্তীতে নির্বাচন অফিসে জমা দেওয়ার জন্য নিম্নোক্ত কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে:
- অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ: অবশ্যই ১৭ ডিজিটের অনলাইন ভেরিফাইড জন্ম নিবন্ধন সনদের ফটোকপি (বাংলা ও ইংরেজি উভয় অংশ থাকতে হবে)।
- শিক্ষাগত সনদের কপি: এসএসসি (SSC), দাখিল বা সমমানের পরীক্ষার সনদপত্র বা এডমিট কার্ডের কপি (বয়স ও ইংরেজি নামের বানানের প্রমাণ হিসেবে)। নিরক্ষরদের ক্ষেত্রে জন্ম সনদই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
- পিতা-মাতার এনআইডি: পিতা ও মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের স্পষ্ট ফটোকপি। পিতা বা মাতা মৃত হলে মৃত্যু সনদের কপি প্রযোজ্য হতে পারে।
- নাগরিকত্ব সনদ: সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত মূল নাগরিকত্ব সনদ বা প্রত্যয়নপত্র।
- ঠিকানার প্রমাণপত্র: বর্তমান বা স্থায়ী ঠিকানার সত্যতা প্রমাণের জন্য বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিলের কপি অথবা বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ বা জমির খতিয়ান/দলিলের কপি।
- রক্তের গ্রুপের সনদ: যেকোনো অনুমোদিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার মূল রিপোর্ট বা প্যাথলজি স্লিপ।
- বিবাহিতদের ক্ষেত্রে: আবেদনকারী বিবাহিত হলে স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডি কার্ডের ফটোকপি এবং নিকাহনামা বা বিবাহ সনদের কপি।
ধাপে ধাপে অনলাইনে নতুন ভোটার আবেদন করার নিয়ম
অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ। নিচে ধাপে ধাপে নির্দেশনা দেওয়া হলো:
ধাপ ১: নির্বাচন কমিশনের পোর্টাল ভিজিট ও রেজিস্ট্রেশন
প্রথমেই কম্পিউটার বা মোবাইল ব্রাউজার থেকে নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল এনআইডি পোর্টাল services.nidw.gov.bd-এ প্রবেশ করুন। হোমপেজে থাকা “আবেদন করুন” বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ২: প্রাথমিক তথ্য ও মোবাইল ভেরিফিকেশন
আপনার পূর্ণ নাম (ইংরেজিতে), জন্মতারিখ এবং প্রদর্শিত ক্যাপচা কোডটি সঠিকভাবে পূরণ করে “বহাল” বাটনে ক্লিক করুন। এরপর আপনার সচল একটি মোবাইল নম্বর দিন এবং “বার্তা পাঠান” বাটনে ক্লিক করুন। মোবাইলে আসা ৬ ডিজিটের ওটিপি (OTP) কোডটি দিয়ে মোবাইল ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন।
ধাপ ৩: ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্যাবলী পূরণ
এবার মূল আবেদন ফরমটি খুলে যাবে। এখানে ৪টি সেকশন রয়েছে:
- ব্যক্তিগত তথ্য: নাম (বাংলা ও ইংরেজিতে), লিঙ্গ, রক্তের গ্রুপ, ধর্ম, বৈবাহিক অবস্থা এবং শনাক্তকরণ চিহ্ন সঠিকভাবে পূরণ করুন।
- পিতা-মাতার তথ্য: পিতা ও মাতার নাম এবং তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর উল্লেখ করুন।
- অন্যান্য তথ্য: আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা, বর্তমান পেশা এবং কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা নির্বাচন করুন।
ধাপ ৪: ঠিকানা নির্বাচন (স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা)
ভোটার এলাকা নির্ধারণের জন্য ঠিকানা নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভাগ, জেলা, উপজেলা/থানা, ইউনিয়ন/ওয়ার্ড, গ্রাম ও ডাকঘর নির্বাচন করুন। মনে রাখবেন, আপনি যে ঠিকানায় ভোটার হতে চান (বর্তমান অথবা স্থায়ী), সেই এলাকার সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে আপনাকে কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
ধাপ ৫: ফরম-২ প্রিভিউ ও পিডিএফ ডাউনলোড
সকল তথ্য পূরণ শেষে পুনরায় যাচাই করুন। সব তথ্য সঠিক থাকলে সাবমিট করুন। সাবমিট করার পর একটি ৩ পাতার “ভোটার নিবন্ধন ফরম-২” (Form-2) তৈরি হবে। এটি পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করে এফোর (A4) সাইজের কাগজে স্পষ্ট প্রিন্ট করে নিন।
উপজেলা নির্বাচন অফিসে বায়োমেট্রিক প্রদান
অনলাইনে ফরম প্রিন্ট করার পর তাতে নির্দিষ্ট স্থানে আবেদনকারীর স্বাক্ষর ও তারিখ দিন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর) এর স্বাক্ষর ও সিল গ্রহণ করুন। এরপর প্রিন্টকৃত ফরম-২ এর সাথে প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি সংযুক্ত করে আপনার উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে সশরীরে উপস্থিত হন।
সেখানে নির্বাচন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে আপনার:
- ১০ আঙুলের ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হবে।
- উচ্চমানের ডিজিটাল ক্যামেরায় প্রার্থীর ছবি তোলা হবে।
- চোখের আইরিশ স্ক্যান করা হবে।
বায়োমেট্রিক গ্রহণ শেষে কর্মকর্তা আপনাকে একটি ভোটার নিবন্ধন স্লিপ (Voter Slip) প্রদান করবেন। এই স্লিপটি অত্যন্ত যত্নসহকারে সংরক্ষণ করতে হবে, কারণ স্লিপ নম্বর দিয়েই পরবর্তীতে এনআইডি কার্ড ডাউনলোড করতে হবে।
অনলাইন থেকে ডিজিটাল স্মার্ট এনআইডি ডাউনলোড
বায়োমেট্রিক প্রদানের কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের ব্যাকএন্ড যাচাই সম্পন্ন হলে আবেদনকারীর মোবাইলে অভিনন্দন জানিয়ে একটি কনফার্মেশন এসএমএস পাঠানো হবে। এসএমএস পাওয়ার পর:
- পুনরায়
services.nidw.gov.bdপোর্টালে যান এবং “রেজিস্ট্রেশন” অপশনে ক্লিক করুন। - আপনার ভোটার স্লিপ নম্বর অথবা এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ ও ঠিকানার তথ্য দিন।
- মোবাইল ভেরিফিকেশন ও Google Play Store থেকে NID Wallet অ্যাপ ইনস্টল করে ফেস ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন।
- সফল ভেরিফিকেশন শেষে লগইন করে আপনার ডিজিটাল কালার এনআইডি কার্ডের পিডিএফ কপি ডাউনলোড করে নিন। এটি লেমিনেটিং করে সরকারি ও বেসরকারি সকল দাপ্তরিক কাজে মূল এনআইডির মতোই ব্যবহার করতে পারবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
নতুন ভোটার হতে কি কোনো সরকারি ফি দিতে হয়?
না, প্রথমবার নতুন ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার জন্য কোনো প্রকার সরকারি ফি দিতে হয় না। এটি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
অনলাইনে ফর্ম পূরণের পর নির্বাচন অফিসে যাওয়া কি বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, ছবি তোলা, ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশ প্রদানের জন্য প্রিন্টকৃত ফরম ও কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে সশরীরে উপস্থিত হওয়া আবশ্যক।
ভোটার স্লিপ দিয়ে কি চাকরি বা ব্যাংকে কাজ চালানো যাবে?
স্লিপ পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অনুমোদন দিলে অনলাইন থেকে রঙিন ডিজিটাল এনআইডি কপি ডাউনলোড করা যায়, যা সরকারি চাকরি ও ব্যাংকিং সেবাসহ সকল ক্ষেত্রে শতভাগ বৈধ হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
অনলাইন জন্ম নিবন্ধন কি বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য ১৭ ডিজিটের অনলাইন ভেরিফাইড জন্ম নিবন্ধন সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। হাতে লেখা পুরাতন জন্ম সনদ গ্রহণযোগ্য নয়।
