পিতার নাম সংশোধন করতে কি কি কাগজপত্র লাগে ২০২৬, অনলাইন আবেদনের নিয়ম
জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) পিতার নামের সামান্য একটি বানান ভুল কিংবা অমিলের কারণে পাসপোর্ট তৈরি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, জমি রেজিস্ট্রি এবং সরকারি চাকরির পুলিশ ভেরিফিকেশনে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হয়। এনআইডি কার্ডে পিতার নাম সংশোধনের জন্য মূল প্রমাণক হিসেবে প্রার্থীর এসএসসি বা সমমানের সনদ, অনলাইন ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন এবং পিতার এনআইডি কার্ডের কপি প্রধান দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল পোর্টালে (services.nidw.gov.bd) প্রথমবার আবেদনের সরকারি ফি ভ্যাটসহ মাত্র ২৩০ টাকা এবং সঠিক কাগজপত্র দাখিল করলে সাধারণত ২০ থেকে ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে এই সংশোধন সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
অনেকেই না জেনে ভুল বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্র আপলোড করার কারণে দিনের পর দিন আবেদন পেন্ডিং থাকে কিংবা নির্বাচন কমিশন থেকে তা বাতিল (Reject) করে দেওয়া হয়। পিতা জীবিত নাকি মৃত, প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে কি নেই—এমন প্রতিটি ভিন্ন পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় দলিলের তালিকা ভিন্ন হয়ে থাকে। এই আর্টিকেলে পিতার নাম সংশোধনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সম্পূর্ণ চেকলিস্ট, সরকারি ফি তালিকা, ধাপে ধাপে অনলাইন আবেদন এবং চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিশেষ দিকনির্দেশনা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
সরাসরি নোটিফিকেশন পেতে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল, প্রশ্ন ও আলোচনার জন্য ফেসবুক গ্রুপ এবং নিয়মিত আপডেটের জন্য পেজ ফলো করুন।
একনজরে এনআইডিতে পিতার নাম সংশোধন তথ্য ২০২৬
| সেবার নাম | জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতার নাম সংশোধন (বাংলা ও ইংরেজি) |
|---|---|
| অফিশিয়াল ওয়েবসাইট | services.nidw.gov.bd |
| ১ম বার সংশোধন ফি | ২৩০ টাকা (১৫% ভ্যাটসহ) |
| ২য় বার সংশোধন ফি | ৩৪৫ টাকা (১৫% ভ্যাটসহ) |
| প্রক্রিয়াকরণ সময় | ২০ থেকে ৪৫ কার্যদিবস (ক্যাটাগরিভেদে) |
| নির্বাচন কমিশন হেল্পলাইন | ১০৫ (টোল-ফ্রি, রবি-বৃহস্পতি সকাল ৯টা হতে বিকাল ৫টা) |
পিতার নাম সংশোধন করতে কি কি কাগজপত্র লাগে (পরিস্থিতি অনুযায়ী চেকলিস্ট)
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুসারে, প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পারিবারিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে কাগজপত্রের চাহিদা নির্ধারিত হয়। নিচে প্রতিটি ক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. আবেদনকারী যদি এসএসসি বা সমমান পাস হন (সবচেয়ে সহজ ক্যাটাগরি)
- এসএসসি/দাখিল/সমমান সনদের মূল কপি: মূল সার্টিফিকেট ও এডমিট কার্ড যেখানে পিতার সঠিক নাম রয়েছে।
- পিতার জাতীয় পরিচয়পত্র: পিতার মূল এনআইডি কার্ডের উভয় পিঠের পরিষ্কার ফটোকপি।
- ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ: বিডিআরআইএস (BDRIS) সার্ভারে ভেরিফাইড ১৬ বা ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ।
২. পিতা যদি মৃত হন (Deceased Father)
- পিতার ডিজিটাল মৃত্যু সনদ: সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা কর্তৃক ইস্যুকৃত অনলাইন ভেরিফাইড মৃত্যু সনদ।
- ওয়ারিশান সনদ (Warisan Certificate): স্থানীয় মেয়র বা ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত উত্তরাধিকারী সনদ।
- পিতার এনআইডি বা ভোটার তালিকার কপি: পিতা জীবিত থাকাকালীন এনআইডি বা ২০০৮ সালের ভোটার তালিকার সার্টিফাইড কপি।
৩. আবেদনকারী যদি প্রাতিষ্ঠানিক সনদধারী না হন (অশিক্ষিত বা ৫ম/৮ম শ্রেণি পাস)
- ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের হলফনামা (Affidavit): ১ম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিক কর্তৃক সম্পাদিত ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মূল এফিডেভিট।
- সহোদর ভাই-বোনের এনআইডি/সনদ: আপন ভাই বা বোনের এনআইডি কার্ড ও শিক্ষাগত সনদের কপি (যেখানে পিতার নাম সঠিক রয়েছে)।
- স্থানীয় নাগরিক সনদ ও প্রত্যয়নপত্র: ইউপি চেয়ারম্যান বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক প্রার্থীর পিতার সঠিক নাম উল্লেখপূর্বক বিশেষ প্রত্যয়নপত্র।
- পিতা সরকারি চাকরিজীবী হলে: পিতার সার্ভিস বুক (Service Book) বা পেনশন সনদের সত্যায়িত অনুলিপি।
ধাপে ধাপে অনলাইনে পিতার নাম সংশোধনের সঠিক নিয়ম
নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল পোর্টালে ঘরে বসেই মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে সংশোধনের আবেদন দাখিল করা যায়। প্রক্রিয়াটি নিচে ক্রমানুসারে দেওয়া হলো:
ইন্টারনেট ব্রাউজার থেকে services.nidw.gov.bd ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর বা ইউজারনেম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। পূর্বে অ্যাকাউন্ট না থাকলে NID নম্বর, জন্ম তারিখ এবং ফেস ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করে রেজিস্ট্রেশন করে নিন।
ধাপ ২: প্রোফাইল সম্পাদনা (Edit Profile)
ড্যাশবোর্ডের ডান পাশে থাকা ‘প্রোফাইল’ ট্যাবে ক্লিক করুন এবং ওপরের ‘সম্পাদনা’ বাটনে প্রেস করুন। এবার ব্যক্তিগত তথ্যের তালিকায় থাকা ‘পিতার নাম (বাংলা)’ এবং ‘পিতার নাম (ইংরেজি)’-এর পাশের চেকবক্সে টিক চিহ্ন দিন।
ধাপ ৩: সঠিক নাম টাইপ করুন
এসএসসি সনদ বা পিতার মূল এনআইডি কার্ড অনুযায়ী পিতার নির্ভুল বাংলা ও ইংরেজি নাম টাইপ করুন। একটি অক্ষরেরও যেন কোনো অমিল না থাকে তা কয়েকবার মিলিয়ে নিন।
ধাপ ৪: বিকাশ বা রকেটে সরকারি ফি পরিশোধ
বিকাশ অ্যাপের ‘Pay Bill’ অপশনে গিয়ে ‘NID Service’ সিলেক্ট করুন। আবেদনের ধরন হিসেবে ‘এনআইডি তথ্য সংশোধন’ বেছে নিয়ে আপনার NID নম্বর দিয়ে নির্ধারিত ২৩০ টাকা ফি প্রদান করুন। ফি জমা হওয়ার সাথে সাথে পোর্টালে ব্যালেন্স ক্রেডিট দেখাবে।
ধাপ ৫: কাগজপত্র আপলোড ও চূড়ান্ত সাবমিট
ডকুমেন্টস অপশনে গিয়ে প্রতিটি সনদের ধরন (যেমন: SSC Certificate, Father’s NID, Birth Certificate) সিলেক্ট করে পরিষ্কার স্ক্যান কপি আপলোড করুন (প্রতিটি ফাইলের সাইজ ৫০০ কেবির মধ্যে হতে হবে)। এরপর ‘পরবর্তী’ বাটনে ক্লিক করে তথ্য রিভিউর পর ফাইনাল ‘সাবমিট’ সম্পন্ন করুন।
ধাপ ৬: আবেদন ফর্ম ডাউনলোড ও ট্র্যাকিং
আবেদন সফলভাবে দাখিল হলে একটি ‘Application Form’ পিডিএফ জেনারেট হবে। এটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে রাখুন। এতে একটি অ্যাপ্লিকেশন ট্র্যাকিং আইডি থাকবে, যা দিয়ে আপনি পরবর্তীতে আবেদনের বর্তমান অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
এনআইডি তথ্য সংশোধন সরকারি ফি তালিকা ২০২৬
| সংশোধনের ধরন | মূল ফি | ১৫% ভ্যাটসহ মোট ফি |
|---|---|---|
| ব্যক্তিগত তথ্য (পিতার নাম) প্রথমবার সংশোধন | ২০০ টাকা | ২৩০ টাকা |
| ব্যক্তিগত তথ্য দ্বিতীয়বার সংশোধন | ৩০০ টাকা | ৩৪৫ টাকা |
| ব্যক্তিগত তথ্য তৃতীয় বা তদূর্ধ্ব সংশোধন | ৫০০ টাকা | ৫৭৫ টাকা |
| অনলাইন সংশোধিত ডিজিটাল কপি ডাউনলোড | ০ টাকা | সম্পূর্ণ ফ্রি |
পিতার নাম সংশোধন আবেদন বাতিল হওয়ার কারণ ও সমাধান
অনেকের আবেদন জমা দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশন তা বাতিল (Cancel/Reject) করে দেয়। এর প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- অস্পষ্ট বা মোবাইলে তোলা বাঁকা ছবি আপলোড: স্ক্যানারের বদলে মোবাইলে তোলা ঘোলা বা কাটা সনদের ছবি দিলে আবেদন বাতিল হয়। সবসময় পরিষ্কার কালার স্ক্যান কপি দিন।
- আংশিক বনাম আমূল পরিবর্তন: সামান্য বানান ভুল (যেমন: ‘Ali’ এর জায়গায় ‘Aly’) সাধারণ ক্যাটাগরিতে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা অনুমোদন করতে পারেন। কিন্তু পিতার নাম সম্পূর্ণ বদলে ফেলার চেষ্টা করলে তা ‘গ’ ক্যাটাগরির জটিল তদন্তে যায় এবং ম্যাজিস্ট্রেট হলফনামা ছাড়া বাতিল হয়।
- পিতা মৃত হলে মৃত্যু সনদ না দেওয়া: পিতা মৃত অথচ আবেদনে শুধু ভাইয়ের এনআইডি দেওয়া হলে তদন্ত কর্মকর্তা সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং ফাইল রিজেক্ট করেন।
টেলিটক ও সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
যদি আপনার এনআইডিতে পিতার নাম ভুল থাকে এবং বর্তমানে কোনো সরকারি চাকরির আবেদন চলছে, তবে অবিলম্বে এই পদক্ষেপগুলো নিন:
- টেলিটকের অনলাইন আবেদন ফরম পূরণের সময় সবসময় আপনার এসএসসি (SSC) সার্টিফিকেটের হুবহু নাম ও পিতার নাম ব্যবহার করুন।
- একই সাথে নির্বাচন কমিশন পোর্টালে এনআইডি সংশোধনের অনলাইন আবেদন সাবমিট করে প্রাপ্ত সংশোধন আবেদন ফরম (Application Copy) প্রিন্ট করে নিজের কাছে রাখুন।
- যদি ভাইভা পরীক্ষার আগে সংশোধিত নতুন স্মার্ট কার্ড না পান, তবে ভাইভা বোর্ডে এনআইডির পাশাপাশি এই অনলাইন সংশোধন স্লিপটি প্রদর্শন করলে কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার আইনি জটিলতা ছাড়াই আপনাকে অনুমোদন প্রদান করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
পিতার নাম সংশোধন হতে কত দিন সময় লাগে?
কাগজপত্র নিখুঁত থাকলে এবং শুধু বানানের সাধারণ ভুল হলে সাধারণত ২০ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুমোদন হয়ে যায়। তবে আমূল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তদন্তের প্রয়োজনে ৪৫ কার্যদিবস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
পিতা মৃত হলে কি কি কাগজপত্র লাগে?
পিতা মৃত হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে ইস্যুকৃত অনলাইন ডিজিটাল মৃত্যু সনদ এবং স্থানীয় চেয়ারম্যান কর্তৃক ওয়ারিশান সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
এসএসসি সনদ না থাকলে কি পিতার নাম সংশোধন করা সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব। প্রাতিষ্ঠানিক সনদ না থাকলে ১ম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের ৩০০ টাকার এফিডেভিট (হলফনামা), ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন এবং সহোদর ভাই-বোনের এনআইডি কার্ড জমা দিয়ে আবেদন করতে হয়।
পিতার নাম সংশোধনের সরকারি ফি কত?
প্রথমবার সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি ২০০ টাকা এবং ১৫% ভ্যাটসহ সর্বমোট ২৩০ টাকা। দ্বিতীয়বার ৩45 টাকা এবং তৃতীয়বার ৫৭৫ টাকা।
আবেদন কি উপজেলা নির্বাচন অফিসে জমা দিতে হয়?
অনলাইনে আবেদন ও ফি সাবমিটের পর কোনো জটিলতা না থাকলে অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে নামের বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তা শুনানির জন্য মূল কাগজপত্রসহ স্বশরীরে উপস্থিত হতে বলতে পারেন।
